জলবায়ু পরিবর্তনের অভিশাপ আর স্থানীয় রাজনৈতিক দুর্নীতির যোগসাজশ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রাস করছে। বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা উরির চর বা সন্দ্বীপের মতো বহু জনপদ কেবল প্রকৃতির রোষানলে নয়, বরং নিম্নমানের সুরক্ষা প্রকল্প আর লুটপাটের কারণেও দ্রুত মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে। একদিকে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের ব্যর্থতা—এই দ্বিমুখী আঘাতে উপকূলের লাখ লাখ মানুষ এখন জলবায়ু শরণার্থী।
একসময় উরির চরের জমি ছিল সবুজ আর জীবন ছিল সহজ। এখন সেখানে শুধুই ভাঙনের ক্ষত। গত পাঁচ বছরে নদী ও সাগরের ভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বিবি (৫৫), যিনি তিনবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন, কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “নদী ভাঙতে ভাঙতে এইখানে আসছে। সরকার বাঁধ দিছিলো, কিন্তু সে বাঁধ দুই বর্ষাও টিকল না। বালুর বস্তা না দিয়ে মাটি দিয়া বানাইছিল, সব নিয়া গেছে পানি। আর নেতারা টাকা ভাগ কইরা খাইলো।”
আমেনা বিবির এই অভিযোগ কেবল তার একার নয়; উপকূলীয় জেলাগুলোতে নদী ভাঙন রোধে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু দুর্বল নির্মাণ কাজ এবং প্রকল্প-স্বল্পতার কারণে তা প্রায়শই ব্যর্থ হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার প্রধান কারণ হলো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবেশকর্মী জানান, "বাঁধ তৈরির আগে থেকেই সবাই জানে যে এটা টিকবে না। কারণ এটি কেবল একটি প্রকৌশলগত ব্যর্থতা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা। যতবার বাঁধ ভাঙে, ততবার নতুন বরাদ্দের সুযোগ তৈরি হয়—আর এই চক্রে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হতে থাকে।"
দুর্নীতি ও জলবায়ুর এই দ্বৈত আঘাতে উপকূলের মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। চাষের জমি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা কাজ হারাচ্ছেন। মৎস্যজীবীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরছেন, কারণ তাদের নৌকা ও জাল রক্ষার কোনো টেকসই জেটি বা বন্দর নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফ হোসেন মনে করেন, এই সমস্যার সমাধানে কেবল অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি তহবিল যেন দুর্নীতিবাজদের পকেটে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর মনিটরিং এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।”
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই 'জলবায়ু ঋণ' মারাত্মক। কিন্তু তার থেকেও মারাত্মক হলো সেই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, যা দেশের নিজস্ব উদ্যোগগুলোকেও ব্যর্থ করে দিচ্ছে। উরির চর আজ শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা—যেখানে প্রকৃতি ও দুর্নীতির হাতে একইসাথে ধ্বংস হচ্ছে মানুষের স্বপ্ন।