চট্টগ্রাম: ২৫শে মার্চ, ১৯৭১। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১০টা। চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (৮ বেঙ্গল) তখন বিরাজ করছে এক পিনপতন নীরবতা ও চরম উত্তেজনা। একদিকে কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাঞ্জুয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে টু-আইসি মেজর জিয়াউর রহমানের অদম্য দেশপ্রেম ও বিচক্ষণ রণকৌশল। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সেদিন এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
সারাদিন বন্দরে জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস আর শহরের ব্যারিকেড সরানো নিয়ে বাঙালি অফিসার ও পাকিস্তানি কমান্ডারের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। কর্নেল জাঞ্জুয়া বুঝতে পেরেছিলেন, মেজর জিয়ার নেতৃত্বে বাঙালি অফিসাররা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের শক্তি খর্ব করতে জাঞ্জুয়া এক ধূর্ত চাল চালেন। তিনি কৌশলে মেজর জিয়াকে ইউনিট থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে করে বন্দরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেন।
কার্যত বন্দি মেজর জিয়া:
নৌবাহিনীর একটি ৩-টনী ট্রাকে ৩০ জন সৈন্যসহ যখন মেজর জিয়াকে রওনা করানো হয়, তখন তার পাহারায় জুড়ে দেওয়া হয় দুই পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার— আজম ও হুমায়ুনকে। গোয়েন্দা বিভাগে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেজর জিয়া বুঝতে পারেন, তিনি এখন কার্যত পাকিস্তানি সেনাদের কব্জায়। কিন্তু তার চেহারায় ছিল অটল গাম্ভীর্য।
ঐতিহাসিক সেই ফিসফাস:
গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ট্রাকের জানালার পাশে এগিয়ে আসেন ক্যাপ্টেন চৌধুরি খালেকুজ্জামান। সুযোগ বুঝে অত্যন্ত গোপনে মেজর জিয়া তাকে নিচু স্বরে এক ঐতিহাসিক বার্তা দিয়ে যান:
“তুমি এই ব্যাটালিয়নের সবচেয়ে পুরনো অফিসার। চোখ-কান খোলা রেখো। সন্দেহজনক কিছু ঘটলেই আমাকে জানিও।”
অপেক্ষা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের:
ইউনিটে তখন অস্ত্র বলতে মাত্র শ’দুয়েক রাইফেল, কোনো ভারী মেশিনগান নেই। এমতাবস্থায় মেজর জিয়াকে সরিয়ে দিয়ে জাঞ্জুয়া ভেবেছিলেন তিনি সফল। কিন্তু সেই রাতই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের রাত। ট্রাকে বসেও মেজর জিয়ার মস্তিষ্ক তখন কাজ করছিল স্বাধীনতাকামী এক সৈনিকের ক্ষিপ্রতায়, যা কয়েক ঘণ্টা পরই রূপ নিয়েছিল ঐতিহাসিক বিদ্রোহে।