— সমকালীন কলাম / উপ-সম্পাদকীয়
১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা নাট্যগুরু নুরুল মোমেনের একক নাটক ‘নেমেসিস’ (১৯৪৪) কেবল বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি নয়; এটি সংকটকালীন সমাজ, শাসনব্যবস্থা ও মানুষের মনস্তত্ত্বের এক অনন্য দলিল। নাটকের মূল চরিত্র সুরজিৎ নন্দী একজন আদর্শবাদী স্কুলশিক্ষক থেকে কীভাবে চালের কালোবাজারি ও সুযোগসন্ধানী ঠিকাদারে পরিণত হন, তা আশি বছর পরও বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বের এক নির্ভুল আয়না।
‘নেমেসিস’-এ সুরজিতের রাতারাতি ধনকুবের হওয়ার মূল হাতিয়ার ছিল খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অসাধু মজুতদারি। সাধারণ মানুষের অনাহারকে পুঁজি করে সে নিজের সম্পদ গড়ে তোলে।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়—জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি সত্ত্বেও বাজার ‘সিন্ডিকেট’ ও কৃত্রিম সংকটের খবর নিত্যদিনের। আশি বছর আগে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে যে অসাধু মুনাফাখোরি মানুষকে চরম বিপদে ফেলেছিল, আজকের আধুনিক বাজারেও একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি হতে দেখা যায়।
সুরজিতের পতন ত্বরান্বিত হয় যখন সে জরুরি সময়ের ত্রাণ ও ঠিকাদারি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনৈতিক অর্থ উপার্জনে নেমে পড়ে।
প্রশাসনিক কাঠামোর মাঠ পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ত্রাণ বণ্টন কিংবা প্রকিউরমেন্টে (সরকারি কেনাকাটা) স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে সেখানে একশ্রেণির অনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগী সংস্কৃতির জন্ম হয়। ‘নেমেসিস’ আমাদের সতর্ক করে—প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সঠিক নজরদারি না থাকলে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় প্রকিউরমেন্টও কীভাবে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
সুরজিতের নীতিভ্রষ্ট হওয়ার পেছনে বড় অনুঘটক ছিল সামাজিক ও পারিবারিক চাপ। ধনী শ্বশুরের দেওয়া বৈষয়িক শর্ত তার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং কেবল বৈষয়িক সাফল্যকে সমাজের একমাত্র মাপকাঠি ভাবার প্রবণতা তরুণদের প্রতিনিয়ত এক কঠিন বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সততা ও মেধার চেয়ে যখন দ্রুত অর্থবিত্তই সামাজিক মর্যাদার সূচক হয়ে ওঠে, তখন সমাজে 'সুরজিৎ'-দের মতো শর্টকাট খোঁজার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
নাটকে রাষ্ট্র বা আইনি সংস্থা সুরজিৎকে গ্রেফতার বা শাস্তি দেয়নি। তার বিচার এসেছে নিজের তীব্র অপরাধবোধ এবং সহযোগী আসিমের প্রাণঘাতী প্রতারণার মধ্য দিয়ে—যা গ্রিক দেবী 'নেমেসিস'-এর অমোঘ শাস্তির প্রতীক।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুদক বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে অপরাধ থামে না; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, প্রতারণা ও চরম সামাজিক বিশৃঙ্খলা নেমে আসে।
একটি সুশাসিত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কেবল কাগজে-কলমে আইন থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, সরকারি প্রকিউরমেন্টে শতভাগ স্বচ্ছতা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য সততার সাথে গড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ। তা না হলে, নুরুল মোমেনের ৮২ বছর আগের ‘নেমেসিস’-এর বার্তা কেবল একটি নাটকের গল্প হয়ে থাকবে না, তা বারবার আমাদের জাতীয় জীবনের কঠোর বাস্তবতা হয়ে ফিরে আসবে।