প্রচ্ছদ প্রতিবেদন: ডিকোড বেঙ্গল
৪ সেপ্টেম্বর, কারাকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরে বন্দিদশায় আরও একটি জন্মদিন পার করছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গ্রেপ্তারের পর থেকে দীর্ঘ দুই বছর ধরে তিনি কারারুদ্ধ। একসময় টিএসসির রাজপথে 'মানবিক' পরিচিতি পাওয়া একজন ছাত্রনেতার ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ, ২০২৪-এর বিতর্কিত ভূমিকা এবং পরবর্তী এই দীর্ঘ বন্দিজীবন—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি ও বিচারিক ব্যবস্থার এক জটিল সমীকরণকে সামনে নিয়ে আসে।
আদর্শের রূপান্তর: ২০১৮-এর রাজপথ থেকে ২০২৪-এর ক্ষমতা তানভীর হাসান সৈকতের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বৈপরীত্যে ভরা। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে রাজপথে ছিলেন। পরবর্তীতে করোনাকালে টিএসসি এলাকায় ভাসমান মানুষদের খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে তিনি জনবান্ধব ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। তবে ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার চেয়ে দলীয় কমান্ড সুসংহত করাই প্রাধান্য পায়, যা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে তাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
ক্যাম্পাসের সীমানা ও আইনি বিচারিক ভিত্তি সৈকতের সমর্থক ও আইনজীবীদের প্রধান আইনি যুক্তি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের সীমানার ভেতরে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ফৌজদারি আইনের কাঠামো অনুযায়ী, অপরাধের ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াও নির্দেশ প্রদান, প্ররোচনা বা নেতৃত্বের দায়ে (Command Responsibility) মামলা দায়েরের আইনি সুযোগ রয়েছে। নিউমার্কেট, চানখাঁরপুল ও শাহবাগ এলাকার সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের ওপরই নির্ভরশীল।
দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারিক মানদণ্ড: কেবলই কি রাজনৈতিক পরিচয়? কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বিচারিক নিষ্পত্তির আগেই কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা দলগত দায়কে ভিত্তি করে দুই বছর ধরে আটক রাখা বিচারিক কাঠামোর জন্য এক বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিরও দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। গুরুতর অভিযোগ থাকলেও প্রাক-বিচার কারাবাস (Pre-trial detention) যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত হয়, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যকার সীমানা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
ক্ষমতার পরিবর্তন, নিষিদ্ধ সংগঠনের তকমা এবং দীর্ঘ বন্দিজীবন—এই প্রেক্ষাপটে তানভীর হাসান সৈকতের বর্তমান স্থিতি কেবল একজন ব্যক্তির আইনি লড়াই নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ক্ষমতার রূপান্তর, বিচারিক বিলম্ব এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন মানদণ্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয়।