নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
একটি আধুনিক সভ্য দেশ হিসেবে আমাদের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। হোক সে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান—আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু সম্প্রতি এক পোশাক শ্রমিকের সাথে যা ঘটলো, তা কি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে? শুধু ধর্মীয় তকমা ব্যবহার করে একজন জ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে, গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারার বীভৎস উল্লাস দেখে আজ থমকে দাঁড়িয়েছে মানবতা।
যোগ্যতাই কি কাল হলো দীপু দাসের?
দীপু চন্দ্র দাস। সাধারণ এক পোশাক কর্মী থেকে নিজের শ্রম আর মেধার জোরে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। কিন্তু এই উন্নতিই যেন তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো। জানা যায়, এই পদের জন্য আরও তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তাদের সাথে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ আর পেশাগত ঈর্ষা থেকেই সাজানো হয় এক ভয়ংকর নীল নকশা।
ফেসবুক আইডি বনাম বাটন ফোন: এক পৈশাচিক মিথ্যা
অভিযোগ তোলা হলো, দীপু দাস ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করেছেন। অথচ বাস্তবতা কত নিষ্ঠুর! দীপু দাস কোনো স্মার্টফোনই ব্যবহার করতেন না; তার সম্বল ছিল একটি সাধারণ বাটন ফোন। একটি ভুয়া আইডির স্ক্রিনশটকে পুঁজি করে কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই মেতে ওঠা হলো খুনের উৎসবে।
নারায়েতকবির স্লোগান আর আগুনের লেলিহান শিখা
সহকর্মী থেকে শুরু করে এলাকার শত শত মানুষ—যাদের আমরা 'ধর্মপ্রাণ' বলে জানি—তারা আজ নীরব দর্শক। কারো পকেট থেকে বের হলো স্মার্টফোন ভিডিও করার জন্য, কারো মুখ থেকে বের হলো উল্লাসধ্বনি। কিন্তু একটি হাতও কি এগিয়ে আসেনি বলতে যে, "থামো! ইসলাম শান্তির ধর্ম, আইন নিজের হাতে তুলে নিও না"?
অর্ধমৃত দীপুকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে যখন জ্যান্ত অবস্থায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো, তখন সেই আগুনের শিখা কি কেবল দীপুর শরীর পুড়িয়েছিল? নাকি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল আমাদের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর মানবিক মূল্যবোধ?
রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন
আমাদের দেশে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। যদি দীপু দাস কোনো অপরাধ করেও থাকতেন, তবে তাকে আইনের হাতে তুলে দেয়াই ছিল প্রকৃত নাগরিকের দায়িত্ব। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারা কি ইসলামের অবমাননা নয়? যারা শান্তির ধর্মের দোহাই দিয়ে এই বীভৎসতা চালালো, তারা কি আসলে ধর্মের সম্মান রক্ষা করলো, নাকি ধর্মকে কলঙ্কিত করলো?
অভিশপ্ত আকাশ আর বিচারহীনতার কান্না
দীপু দাসের বৃদ্ধ বাবা-মা, সদ্য বিধবা স্ত্রী আর পিতৃহারা অবুঝ সন্তানের বুকফাটা আর্তনাদ আজ আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা এই পৈশাচিকতা করেছে, তারা হয়তো দুনিয়ার বিচারে পার পেয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু স্রষ্টার বিচার থেকে কি পালানো সম্ভব?
প্রকৃতির বিচার বড় নিষ্ঠুর। সেই অসহায় পরিবারের চোখের জল আর দীপুর অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপ কি সইতে পারবে এই সমাজ? আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কি মানুষ হতে পেরেছি, নাকি ধর্মের লেবাস পরা একদল উন্মত্ত হিংস্রতাকেই আমরা আমাদের পরিচয় বানিয়ে ফেলেছি?
"বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।" — এই বিচার যেন কেবল স্রষ্টার ওপর ছেড়ে না দিয়ে, দেশের প্রচলিত আইনেই এই জঘন্যতম অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
Online Desk