নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দুই যুগ আগে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে সেই নারকীয় বোমা হামলার ঘটনায় ১০ জন নিহত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ১৩ মে উচ্চ আদালত এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। তবে বিচারিক আদালতের (নিম্ন আদালত) দেওয়া ৮ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বদলে গিয়ে অধিকাংশ আসামির সাজা নাটকীয়ভাবে কমে আসায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
১. রায়ে সাজার আমূল পরিবর্তন
২০১৪ সালে বিচারিক আদালত মুফতি হান্নানসহ ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের বেঞ্চ সেই সাজা সংশোধন করে নিম্নোক্ত রায় দেন:
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা তাজউদ্দিনের (সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই) সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। শাহাদাত উল্লাহ জুয়েলের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখা হয়েছে।
- ১০ বছর কারাদণ্ড: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ জন (আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম, আব্দুল হাই ও শফিকুর রহমান) এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ৩ জনের (সাব্বির, শেখ ফরিদ ও আবু তাহের) সাজা কমিয়ে মাত্র ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
- বাদ পড়া আসামি: মুফতি হান্নানের ফাঁসি অন্য মামলায় কার্যকর হওয়ায় এবং অন্য দুই আসামি (আব্দুর রউফ ও ইয়াহিয়া) মারা যাওয়ায় তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
২. যেভাবে সাজা কমল: আইনি মারপ্যাঁচ ও কারণ
আদালতে আসামিপক্ষে লড়াই করেন আলোচিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও সরওয়ার আহমেদ। যে কারণে সাজা কমেছে:
- দীর্ঘ কারাবাস: আইনজীবীরা যুক্তি দেখান যে, আসামিরা ইতিমধ্যে প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতাকে বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে আনেন।
- সাক্ষ্য-প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ: উচ্চ আদালত মনে করেছেন, অনেক আসামির ক্ষেত্রে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণের চেয়ে "পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য" বেশি ছিল, যা ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
- ডিফেন্সের কৌশল: শিশির মনিরসহ আসামীপক্ষের আইনজীবীরা নিম্ন আদালতের রায়ের আইনি ত্রুটি এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সীমাবদ্ধতাগুলো সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।
৩. বিতর্ক ও বর্তমান অবস্থা
এই রায়ের ফলে ১০ বছর সাজাপ্রাপ্ত অনেক আসামি ইতিমধ্যে তাদের কারাজীবনের মেয়াদ পূর্ণ করে ফেলায় অনেকের কারামুক্তির পথ সুগম হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে, এই মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাম্প্রতিক সময়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক মামলায় সফল হওয়ায় জনমনে তাকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, উগ্রবাদী ও স্পর্শকাতর মামলার আসামিদের আইনি ঢাল হয়ে দাঁড়ানোয় ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
সম্পাদকের জন্য বিশেষ নোট:
নিউজটি প্রকাশের সময় ২০২৫ সালের ১৩ মে হাইকোর্ট কর্তৃক ঘোষিত রায়টিই ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আজ ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের প্রেক্ষাপটে এই খবরটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ আজ সেই ঘটনার ঠিক ২৫ বছর পূর্ণ হলো এবং বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
Online Desk