নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ. এফ. রহমান হলের গেস্টরুম নির্যাতনের এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৯-২০ সেশনের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং হল ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক আরিফুজ্জামান সৌরভের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অমানবিক নিপীড়নের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে বিস্ফোরক মোড় হলো, ছাত্রলীগের পদধারী এই নেতা মূলত ছাত্রশিবিরের ‘গুপ্তচর’ বা সলিড অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বর্তমানে নিজেকে প্রকাশ করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌরভের ছাত্রলীগের প্যাডে থাকা নাম এবং শিবিরের ব্যানারের সামনে তোলা ছবি দুটি এখন ভাইরাল, যা ক্যাম্পাসজুড়ে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র: রাত-বিরাতের ‘সিগারেট টোকাই’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর জবানবন্দি অনুযায়ী, হলে ওঠার পর থেকেই সৌরভ তাকে ব্যক্তিগত ভৃত্যের মতো ব্যবহার করতেন। নিজে ধূমপায়ী না হওয়া সত্ত্বেও ভুক্তভোগীকে দিয়ে রাত-বিরাতে নীলক্ষেত থেকে সিগারেট আনাতেন সৌরভ।
"রাত আড়াইটার সময়ও মেসেজ দিয়ে সিগারেট আনতে হুকুম করা হতো। প্রতিবাদ করলে হল থেকে বের করে দেওয়া বা 'শিবির' তকমা দিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দেওয়া হতো। অপমান ও অসহায়ত্ব আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করেছিল।"
শারীরিক নিপীড়ন ও ‘লবিং’ অপবাদ
ঘটনার বিবরণীতে উঠে আসে যে, একবার হলের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে গেস্টরুমে ভুক্তভোগীকে পশুর মতো মারধর ও লাঞ্ছনা করা হয়। সৌরভ তাকে সজোরে বুকের ওপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। ভুক্তভোগীর দাবি, সৌরভের এই ‘ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া’ হলের জুনিয়রদের কাছে এক আতঙ্কের নাম ছিল। নির্যাতনের সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ছিল নিয়মিত ঘটনা।
ছাত্রলীগের পদ এবং ‘গুপ্ত শিবির’ রহস্য
২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর ঘোষিত স্যার এ. এফ. রহমান হল ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সম্পাদক হিসেবে সৌরভের নাম ছিল (তালিকায় মো: আরিফ ইশতিয়াক রাহুলের নামও পাশে দেখা যায়)। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগের এই পদের আড়ালে থেকে সৌরভ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে স্টিম রোলার চালিয়েছেন, তা ছিল পরিকল্পিত।
বর্তমানে সৌরভকে প্রকাশ্যেই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। ভাইরাল হওয়া ছবিতে তাকে শিবিরের লোগোর সামনে হাসিমুখে দেখা যায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন নয়, বরং ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অতিষ্ঠ করে তোলার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র হতে পারে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, "যারা এক সময় ছাত্রলীগের দাপট দেখিয়ে গেস্টরুমে জুনিয়রদের ওপর জুলুম করেছে, আজ তারাই আবার লেবাস বদলে অন্য পরিচয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। এই রাজনৈতিক ডিগবাজি ও সুবিধাবাদ মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে।"
নিশানা এখন ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘সুবিধাবাদীদের’ দিকে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে যারা দীর্ঘ সময় গেস্টরুম কালচারের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন অতিষ্ঠ করেছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের সুষ্ঠু বিচারের আওতায় আনা জরুরি। ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে কারা ‘গুপ্ত শিবির’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে কাজ করে সংগঠনের ক্ষতি করেছে এবং শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছে, তা তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফুজ্জামান সৌরভের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
Online Desk